ইউরোজোনের অর্থনীতিতে আস্থা কমছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের

একাধিক সংকটের কারণে কভিড মহামারী-পরবর্তী ইউরোজেনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি।

একাধিক সংকটের কারণে কভিড মহামারী-পরবর্তী ইউরোজেনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। যার প্রভাব বিভিন্ন সময়ে অর্থনৈতিক সূচকগুলোয় ফুটে উঠেছে। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি মাসে ইউরোজোনের অর্থনীতি নিয়ে স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের আস্থা আবারো কমেছে। অঞ্চলটির অর্থনীতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আশঙ্কার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন সময় পরিসংখ্যানটি সামনে এল যখন মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ছে ও শ্রম বাজার থেকে মিশ্র সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। ফ্রান্সের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সামনের দিনগুলোয় এ পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের। খবর ইউরো নিউজ।

ইউরোপীয় কমিশনের এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, ইউরো অঞ্চলে ইকোনমিক সেন্টিমেন্ট ইন্ডিকেটর বা অর্থনৈতিক মনোভাব সূচক (ইএসআই) গত মাসের তুলনায় দশমিক ৫ পয়েন্ট কমে আগস্টে হয়েছে ৯৫ দশমিক ২। অন্যদিকে পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) তা দশমিক ৩ পয়েন্ট কমে হয়েছে ৯৪ দশমিক ৯। উভয় সূচকই দীর্ঘমেয়াদি গড় ১০০-এর তুলনায় অনেক কম, যা ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ইউরোজোনের অর্থনীতি নিয়ে আস্থার সংকটকে তুলে ধরছে।

অর্থনৈতিক মনোভাবের এ পতনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে শিল্প, সেবা, নির্মাণ ও ভোক্তা খাতে আস্থার ধস। এছাড়া শুধু খুচরা বাণিজ্যে সামান্য উন্নতি দেখা যাচ্ছে।

ইউরোজোনের প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে স্পেনে চলতি মাসে অর্থনৈতিক মনোভাবে সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে। দেশটিতে আগের মাসের তুলনায় ইতিবাচক মনোভাব কমেছে ২ দশমিক ৬ পয়েন্ট। তবে জার্মানি ও ইতালিতে মনোভাব যথাক্রমে এক পয়েন্ট করে কমেছে। নেদারল্যান্ডসে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে, দেশটিতে ৩ দশমিক ৫ পয়েন্ট বেড়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্সে অর্থনৈতিক মনোভাব প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

তবে এ জরিপে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকটকে আমলে নেয়নি ইউরোপীয় কমিশন। কারণ জরিপের জন্য তথ্য সংগ্রহের সময়কাল শেষে এ সংকট শুরু হয়।

জরিপে দেখা গেছে, আগামী বছর ভোক্তা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কা বাড়ছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যবৃদ্ধির অনুভূতি কিছুটা কমেছে। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে শিল্প ও খুচরা খাতে বিক্রিমূল্যের প্রত্যাশা বা উচ্চ দামের পণ্য বিক্রির প্রত্যাশা কমেছে এবং নির্মাণ খাত স্থিতিশীল রয়েছে। তবে সেবা খাতে দ্বিতীয় মাসের মতো বিক্রিমূল্য প্রত্যাশা বেড়েছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি মাসে ইউরোজোনে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সূচক জুলাইয়ের তুলনায় কিছুটা সামান্য কমেছে। এটি দশমিক ৪ পয়েন্ট কমে ১৬ দশমিক ৯ হয়েছে। সেবা, খুচরা ও শিল্পে পরিচালকদের ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নিয়ে আস্থা কিছুটা বেড়েছে। তবে নির্মাণ খাত ও ভোক্তারা গৃহস্থালি পর্যায়ে আর্থিক অবস্থার বিষয়ে বেশি অনিশ্চয়তা জানিয়েছে।

আগস্টে ইউরোজোনে নিয়োগ প্রত্যাশা সূচক দশমিক ৩ পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে ৯৭ দশমিক ৮। মূলত শিল্প, খুচরা ও নির্মাণ খাতে নিয়োগ পরিকল্পনার কারণে আশাবাদ বেড়েছে। অন্যদিকে সেবা খাতে তা স্থিতিশীল রয়েছে।

ইউরোজোনের অন্যতম অর্থনীতি ফ্রান্সে প্রধানমন্ত্রী ফ্রঁসোয়া বায়রু দেশটির পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের তারিখ আগামী ৮ সেপ্টেম্বর এগিয়ে এনেছেন। এ কারণে বাজেট ও রাজনৈতিক ঝুঁকির বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা। ফ্রান্সে নির্বাচন এগিয়ে আনাকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ খেলার মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন ডাচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবিএন আমরোর বিশ্লেষক সোনিয়া রেনোঁ। তার মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বা রাজনৈতিক বাধার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেয়ার মতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন যেন ফ্রঁসোয়া বায়রু।

ফ্রান্সের বিরোধী দলগুলোর বেশির ভাগই এরই মধ্যে সরকারের বিপক্ষে ভোট দেয়ার কথা জানিয়েছে। রেনোঁর মতে, এর ফলে সরকার ৮ সেপ্টেম্বর ধসে পড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রকট।

এবিএন আমরো সতর্ক করে জানিয়েছে, ফ্রান্স যদি আবারো নির্বাচনের পথে হাঁটে, তাহলে ওই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা শুধু ফ্রান্সের অর্থনীতিতে নয়, পুরো ইউরোজোনের বন্ড বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ বিনিয়োগকারীরা সরকারের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও বাজেট নিয়ন্ত্রণকে আরো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করবেন। সে অনুসারে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন।

সে হিসেবে বিনিয়োগকারীদের নজরে রয়েছে ফ্রান্স ও জার্মানির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহারের পার্থক্য ওএটি-বান্ড স্প্রেড। এটি ফ্রান্সের রাজনৈতিক ঝুঁকির একটি মূল সূচক। সাম্প্রতিক সপ্তাহে ওএটি-বান্ড স্প্রেড ৭০ বেসিস পয়েন্ট থেকে বেড়ে ৭৯ বেসিস পয়েন্টে পৌঁছে, যা ৮ সেপ্টেম্বর অনাস্থা ভোটের আগে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ প্রতিফলিত করছে।

এবিএন আমরোর বিশ্লেষকরা আশা করছেন, ভোটের আগে দিনগুলোয় স্প্রেড ৭৫-৮০ বেসিস পয়েন্টের মধ্যে অবস্থান করবে, কারণ বাজার ধীরে ধীরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে পরবর্তী ঘটনাগুলোর ওপর বাজারের চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া নির্ভর করবে। যদি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সংসদ না ভেঙে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন, তবে স্প্রেড ৭০ বেসিস পয়েন্টের দিকে ফিরে আসতে পারে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, নতুন আইনসভা নির্বাচনের ডাক দেয়া হলে সরকারি বন্ডের স্প্রেড দ্রুত বাড়তে পারে। ২০২৪ সালের জুনে নির্বাচন চলাকালে ওএটি-বান্ড স্প্রেড বেড়ে যায়, এবার তার চেয়ে বেশি উচ্চতায় উঠতে পারে।

আরও